1) সজীব বস্তুর জন্য জনন অত্যাবশ্যক কেন?

উত্তর- যে জৈবিক পদ্ধতিতে জীব নিজের অনুরূপ জীব সৃষ্টি করে তাকে জনন বলে। জননের মাধ্যমে জীব তার অস্তিত্ব এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখে । যৌন জননের ফলে অপত্য বংশধরদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্টের সমন্বয় ও পরিব্যক্তির (Mutation) মাধ্যমে ভেদ (Variation) গড়ে ওঠে যা নতুন প্রজাতির উদ্ভবের সহায়ক। তাই বলা যায় জনন জীবের জন্য একটি অত্যাবশ্যক প্রক্রিয়া। 

2) জননের উন্নত ধরণ কোনটি? অযৌন না যৌন জনন? কেন?

উত্তর- নিম্নলিখিত কারণে অযৌন অপেক্ষা যৌন জনন অধিক উন্নত বলা যায়,

ভেদ বা প্রকরণ (Variation)-  যৌন জনন দুটি ভিন্ন জীবদেহে উৎপন্ন গ্যামেটদ্বয়ের মিলনের ফলে জিনগত পুন:সংযুক্তি (genetic recombination) ঘটে, যার ফলে প্রজাতির মধ্যে ভেরিয়েশন দেখা দেয়। 

অভিব্যক্তি (Evolution)- ভেদ বা প্রকরণ প্রাকৃতিক নির্বাচনের মুখ্য উপাদান। এটি বিবতনে বিশেষ ভূমিকা নেয়। 

অভিযোজন (Adaption)- যৌন জননের ফলে উৎপন্ন জীব পরিবেশের সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। অর্থাৎ অভিযোজনে সক্ষম হয়।

তেজস্বী ও জীবনী শক্তি (Vigour and vitality)- যৌন জননের ফলে জীব, জীবনী শক্তি ও তেজস্বীভাব ফিরে পায়।

3) অযৌন জননে সৃষ্ট অপত্যদের ক্লোন বলা হয় কেন?

উত্তর- অযৌন জননের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন জীবের প্রয়োজন পড়ে না। এই পদ্ধতিতে জনিতৃ জীব থেকে রেণু (spore), দ্বি-বিভাজন, খন্ডীভবন ইত্যাদির মাধ্যমে অপত্য জীব সৃষ্টি হওয়ায় এই জীবরা জিনগত এবং অঙ্গসংস্থানিক (morphologically) ভাবে জনিতৃ অনুরূপ হয়। তাই অযৌন জননে সৃষ্ট অপত্যদের ক্লোন বলা হয়।

4) যৌন জননের ফলে সৃষ্ট অপত্যদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে কেন? এই উক্তিটি সর্বদা সত্য হয় কি?

উত্তর- যৌন জননে দুটি জনিতৃ জীবের মিলনের ফলে অপত্য সৃষ্টি হয় বলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অধিক থাকে। যৌন জননের ফলস্বরূপ সন্তানদের মধ্যে ভেদ বা প্রকরণের পুঞ্জীভবন হয় এবং নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে।

উক্তিটি সর্বদাই সত্য। এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট জীব নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হওয়ায় পরিবর্তনশীল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সমর্থ হয় এবং জিনগত পুনঃসংযুক্তির কারণে তাদের জীবনিশক্তিও বৃদ্ধি পায়।

5) অযৌন জননের ফলে সৃষ্ট অপত্যরা যৌন জননে সৃষ্ট অপত্যদের থেকে কিভাবে আলাদা হয়?

উত্তর- অযৌন জননে জনিতৃ জীবের দেহকোশ মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে অথবা রেণু উৎপাদনের মাধ্যমে অপত্য জীবের উৎপত্তি ঘটে। ফলস্বরূপ অপত্য ও জনিতৃ জীবের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। অন্যদিকে যৌন জননে সৃষ্ট জীব মিওসিস বিভাজিনে তৈরী দুটি ভিন্নধর্মী গ্যামেটের মিলনের ফলে উৎপন্ন হওয়ায় এদের মধ্যে যথেষ্ট ভেদ পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ জনিতৃ জীবদের অনুরূপ হয় না।


6) যৌন ও অযৌন জননের মধ্যে পার্থক্য লিখ। অঙ্গজ জননকে অযৌন জনন হিসাবে গন্য করা হয় কেন?

উত্তর-

যৌন জনন-

1) এক্ষেত্রে পিতা ও মাতা পৃথক।

2) গ্যামেট গঠিত হয়।

3)মাইটোসিস ও মিওসিস উভয়ের প্রয়োজন হয়।

4) অপত্য জীব জিনগত ভাবে জনিতৃ জীব থেকে আলাদা।

অযৌন জনন-

1) এক্ষেত্রে জনিতৃ জীব একটি।

2)গ্যামেট গঠিত হয় না।

3) শুধুমাত্র মাইটোসিসের প্রয়োজন হয়।

4) অপত্য ও জনিতৃ জীব পরস্পরের অনুরূপ।

           অঙ্গজ জননে উদ্ভিদ দেহের বিভিন্ন অংশ যেমন- পাতা, মূল, কন্দ (bulb), গ্রন্থিকন্দ (rhizome), স্ফীতকন্দ (tuber) ইত্যাদি থেকে অস্থানিক ও স্থানিক মুকুল তৈরির মাধ্যমে অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে উৎপন্ন জীব ও জনিতৃ জীবের মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। তাই অঙ্গজ জননকে এক বিশেষ ধরনের অযৌন জনন বলা হয়।

7) অঙ্গজ জনন কী? দুটি উপযুক্ত উদাহরণ দাও ।

উত্তর- যে পদ্ধতিতে জনিতৃ উদ্ভিদের দেহাংশ প্রত্যক্ষভাবে জননে করে তাকে উদ্ভিদের অঙ্গজ জনন বলে। জননকে এক বিশেষ ধরনের অযৌন জনন বলা হয়।

উদাহরণ

 i) অস্থানিক মুকুলের (Adventitious bud)- পটল (Tricosanthes spp.), মিষ্টি আলু (Ipomoea spp.) ইত্যাদি উদ্ভিদে মূল থেকে এবং পাথরকুচি (Bryophyllum spp.), বিগনিয়া (Begonia spp.) ইত্যাদি উদ্ভিদে পাতা থেকে উৎপন্ন অস্থানিক মুকুলের সাহায্যে অঙ্গজ জনন দেখা যায়।

ii) বুলবিলের সাহায্যে - চুপড়ি আলু ( Dioscoria spp.), এগেভ (Agave spp.) ইত্যাদি উদ্ভিদে বুলবিলের সাহায্যে অঙ্গজ জনন সম্পন্ন হয়।

8) সংজ্ঞা লিখ।
অ) জুভেনাইল (তরুণ) দশা
আ) জনন দশা
ই) বার্ধক্য দশা

উত্তরঃ 

অ) জুভেনাইল দশা- জন্মগ্রহণের পর থেকে জননে সক্ষম হওয়ার পূর্ববর্তী সময়কালকে জুভেনাইল দশা বলে। এই সময়ে কোশ বিভাজনের ফলে জীবের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এবং তরুণ দশার শেষ পর্যায়ে জনন অঙ্গ পরিণতি লাভ করতে শুরু করে। 

আ) জনন দশা (Reproductive phase)- তরুণ দশার সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই দশার সূচনা ঘটে। এই পর্যায়ে জীব পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করে এবং কোশ বিভাজনের হার কমে যায়। এই সময়ে জীব প্রজননে সক্ষম থাকে অর্থাৎ প্রজননক্ষম থাকে। বিভিন্ন জীবে এই দশার সময় কালের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। 

ই) বার্ধক্য (Senescence)- প্রজননিক দশার সমাপ্তিতে এই দশার সূচনা হয়। এই অবস্থায় জীবের দেহের ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্তি ঘটতে থাকে। যেমন - কোশ বিভাজন প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে, প্রজনন ক্ষমতা লোপ পায়, উদ্ভিদে ক্লোরোফিল কমে যাওয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি। এইভাবে জীব ধীরে ধীরে মৃত্যু মুখে ধাবিত হয়। 


9) যৌন জননের জটিলতা সত্ত্বেও উন্নত জীবের যৌন জনন করে কেন?

উত্তরঃ যৌন জননের জটিলতা সত্ত্বেও উন্নত জীবে যৌন জনন প্রত্যক্ষ করা যায় কারণ যৌন জননের মাধ্যমে জীবের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কে বাড়িয়ে দেয়। যৌন জননের জন্যে দুটি ভিন্ন জীবের প্রয়োজন হয় বলে যৌন জননকারী পপুলেশনে ভেরিয়েশনের আবির্ভাব ঘটে এতে অপত্য জীবরা পরিবর্তনশীল পরিবেশে সহজে বাঁচতে পারে। এই জনন পদ্ধতিটি বিবর্তন সহায়ক। এই জন্য অযৌন অপেক্ষা যৌন জনন জটিলতা সত্ত্বেও উন্নত জীবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।


10)  মিওসিস এবং গ্যামেটোজেনেসিস সব সময় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কেন ব্যাখ্যা কর।  

উত্তরঃ ডিপ্লয়েড (2n) কোশ থেকে হেপ্লয়েড (n) ক্রোমোসোম বিশিষ্ট  পুং ও স্ত্রী গ্যামেট অর্থাৎ শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরীর পদ্ধতিকে গ্যামেটোজেনেসিস বলে। মিওসিস কোশ বিভাজনের মাধ্যমে একটি 2n কোশ থেকে চারটি n ক্রোমোসোম সংখ্যক অপত্য কোশের উৎপত্তি ঘটে।  এই গ্যামেটোজেনেসিস প্রক্রিয়াটি মিওসিস ছাড়া সংঘটিত হবার নয়। তাই বলা যায় মিওসিস ও গ্যামেটোজেনেসিস পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।


11) একটি সপুস্পক উদ্ভিদের প্রতিটি অংশ চিহৃত কর এবং তা ডিপ্লয়েড (2n) না হেপ্লয়েড (n) লিখ।
a) গর্ভাশয়
b)পরাগধানী
c) ডিম্বাণু
d) পরাগরেণু
e) পুং গ্যামেট
f) জাইগোট

উত্তরঃ (a)2n, (b)2n, (c)n, (d)n, (e)n, (f)2n


12) বহিঃ নিষেকের সংজ্ঞা দাও। এর অসুবিধাগুলি লিখ। 

উত্তরঃ নিষেক ( fertilization) প্রক্রিয়া দেহের বাইরে সম্পন্ন হলে তাকে বহিঃনিষেক বলা হয়। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মাধ্যম যথা- জলের প্রযোজন হয়। বিভিন্ন জলজ প্রাণী যেমন- মাছ, ব্যাঙ, সি- আর্চিন ইত্যাদিতে বহিঃ নিষেক দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ প্রাণী একসঙ্গে জলে গ্যামেটের নিঃসরণ ঘটালে নিষেক সম্পন্ন  হয়। 

এই পদ্ধতির বিভিন্ন অসুবিধা রয়েছে, 

i) স্ত্রী ও পুরুষ প্রাণী একসঙ্গে গ্যামেট ত্যাগ না করলে অযথা গ্যামেটের অপচয় ঘটে।
ii) অপত্যদের বিকাশ যেহেতু দেহের বাইরে হয় তাই তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কম থাকে।
iii) শুধুমাত্র জলজ পরিবেশেই সংঘটিত হয়।


13) চলরেণু (Zoospore) এবং  জাইগোটের মধ্যে পার্থক্য লিখ। 

উত্তরঃ ফ্ল্যাজেলা বিশিষ্ট সঞ্চালনে সক্ষম অযৌন রেণুকে চলরেণু বা জুস্পোর বলে। এরা ডিপ্লয়েড অথবা হেপ্লয়েড উভয় প্রকারেরই হতে পারে। সচল রেণুস্থলীতে (Zoosporangium) এইসব রেণুর উৎপত্তি ঘটে। শৈবাল ( Clamydomonas spp. , Volvox spp. ) , ছত্রাক (Synchitrium spp.) ইত্যাদিতে এই রেণু দেখা যায়। 
অন্যদিকে হেপ্লয়েড পুং ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলনে যে ডিপ্লয়েড (2n) কোশের সৃষ্টি হয় তাকে জাইগোট বলে। এই জাইগোট সর্বদাই ফ্ল্যাজেলা বিহীন। জাইগোটের ক্রম বিভাজনে নতুন পূর্ণাঙ্গ জীবের উৎপত্তি ঘটে।

14) এমব্রায়োজেনেসিস (ভ্রূণ উৎপাদন) এবং গ্যামেটোজেনেসিসের (জনন কোশ উৎপাদন) মধ্যে পার্থক্য লিখ।

উত্তরঃ 
এমব্রায়োজেনেসিস-

i) জাইগোট থেকে ভ্রূণ তৈরির পদ্ধতিকে এমব্রায়োজেনেসিস বলে।
ii) ভ্রূণের কোশগুলি ডিপ্লয়েড প্রকৃতির।
iii) মাইটোসিস বিভাজনের দ্বারা জাইগোট থেকে ভ্রূণ তৈরী হয়।

গ্যামেটোজেনেসিস-

i) গ্যামেট তৈরির পদ্ধতিকে গ্যামেটোজেনেসিসের বলে।
ii) গ্যামেট হেপ্লয়েড প্রকৃতির।
iii)  মিওসিস বিভাজনের মাধ্যমে গ্যামেট তৈরি হয়।

15)  একটি ফুলে নিষেকের পরবর্তী কি কি ঘটনা ঘটে বর্ণনা কর।


উত্তরঃ সপুস্পক উদ্ভিদে নিষেক পরবর্তী অর্থাৎ জাইগোটের উৎপত্তির পর যে ঘটনাবলী সংঘটিত হয় তাদের একসঙ্গে নিষেক পরবর্তী ঘটনা বলে। নিষেকের পর ফুলের বিভিন্ন অংশ যথা, পাপড়ি (petal), পুংস্তবক ইত্যাদি ঝরে পড়ে। গর্ভপত্র যথাস্থানে বর্তমান থাকে । জাইগোট থেকে ভ্রূণের উৎপত্তি ঘটে ও ডিম্বকটি বীজে পরিণত হয় এবং সমগ্র ডিম্বাশয়টি থেকে ফলের উৎপত্তি ঘটে। কিছু কিছু উদ্ভিদে ফুলের বৃতি , পুস্পাক্ষ ইত্যাদি থেকেও ফলের সৃষ্টি হয়। তাদের অপ্রকৃত ফল বলে।

16) উভয় লিঙ্গ ফুল কাকে বলে?


উত্তরঃ যেসব ফুলে পুংস্তবক (Androecium) এবং স্ত্রীস্তবক ( Gynoecium) উভয়ই বর্তমান থাকে সে সব ফুলকে উভয় লিঙ্গ ফুল বলে। যেমন- জবা (Hibiscus spp.), রঙ্গন (Ixora spp.) ইত্যাদির ফুল।

17) জরায়ুজ প্রাণীদের অপত্যদের তুলনায় অণ্ডজ প্রাণীদের অপত্যরা তাদের জীবনকালে অধিকতর ঝুঁকির সম্মুখীন হয় কেন?

উত্তরঃ  যে সকল প্রাণীরা ডিম পাড়ে তাদের অণ্ডজ (oviperous) প্রাণী বলে এবং যে সব প্রাণীরা বাচ্চা প্রসব করে তাদের জরায়ুজ (viviparous) প্রাণী বলে। অণ্ডজ প্রাণীদের ডিম তুলনামূলকভাবে বৃহদাকার এবং পরিবেশের প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষার জন্য কঠিন খোলোকে আবৃত থাকে। এই প্রাণীরা নিরাপদ পরিবেশে ডিম পাড়ে এবং নির্দিষ্ট সময়ের অন্তরে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসে। উল্লেখ্য, ভ্রূণের পরিস্ফুটনের প্রয়োজনীয় শক্তি ডিমে সঞ্চিত খাদ্য উপাদান থেকেই আসে। অন্যদিকে জরায়ুজ প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশ মাতৃদেহের অভ্যন্তরেই সম্পন্ন হয়l পরবর্তীতে মা বিকশিত শিশুর জন্ম দেয় এবং মায়ের সন্নিধ্যেই শিশুটি বেড়ে উঠে। তাই বলা যায় অণ্ডজ প্রাণীদের অপত্যদের তুলনায় জরায়ুজ প্রাণীর অপত্যরা পরিবেশ প্রতিকূলতা ও অন্যান্য ঝড় ঝাপটা থেকে যথেষ্ট সুরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ অণ্ডজ প্রাণীর অপত্যরা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যায়।